আমরিন আল ফারাবি ।। আজ ২৯ অক্টোবর, বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। স্ট্রোকের ভয়াবহতা, প্রতিরোধ, দ্রুত চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। স্ট্রোক এমন এক গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা, যা মুহূর্তের মধ্যে একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। তবে সময়মতো চিকিৎসা ও যথাযথ পুনর্বাসনের মাধ্যমে অনেক রোগী আবারও স্বাভাবিক জীবনের অনেকটা অংশ ফিরে পেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন স্ট্রোকের প্রধান ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোক বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ। ২০২১ সালে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ মানুষ নতুন করে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং একই বছরে এ রোগে মৃত্যু হয় প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার মানুষের। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি বাড়লেও যেকোনো বয়সেই স্ট্রোক হতে পারে। তাই ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া কিংবা হাত-পা অবশ হয়ে আসা-এমন লক্ষণকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এগুলো হতে পারে স্ট্রোকের সংকেত। স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করতে ‘BE FAST’ পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। যার অর্থ হলো- হঠাৎ ভারসাম্য হারানো (Balance), দৃষ্টিতে সমস্যা (Eyes), মুখ বেঁকে যাওয়া (Face), হাত দুর্বল হয়ে পড়া (Arms), কথা জড়িয়ে যাওয়া (Speech) এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া (Time)। এসব লক্ষণের যেকোনোটি দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোগীকে কোনো ওষুধ বা খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে স্ট্রোক রোগীর সংখ্যা দিনদিন বাড়লেও সেই তুলনায় বিশেষায়িত রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার বা পুনর্বাসন কেন্দ্র অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ জেলা পর্যায়ে স্ট্রোক-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপি ও থেরাপির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ফলে অনেক রোগী পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
এমনই এক বাস্তবতার শিকার যশোরের পঞ্চাশোর্ধ্ব মো. রফিকুল ইসলাম। বছরখানেক আগে হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁর শরীরের ডান পাশ পুরোপুরি অবশ হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসার পর বেঁচে ফিরলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। রফিকুল ইসলাম বলেন, “স্ট্রোকের পর যখন ডান হাত-পা একদম কাজ করছিল না, তখন মনে হতো জীবনটা এখানেই শেষ। ঠিকমতো দাঁড়াতে পারতাম না, অন্যের সাহায্য ছাড়া এক পাও নড়ার উপায় ছিল না। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নেওয়া শুরু করি। ধীরে ধীরে আমার অবশ অঙ্গগুলো কাজ করতে শুরু করে। আজ আমি কারও সাহায্য ছাড়াই লাঠি ছাড়া হেঁটে চলতে পারছি, যা কিছুদিন আগেও অসম্ভব মনে হতো।”
স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসন ও ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব সম্পর্কে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের শিক্ষক ও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক ডা. আহমাদুল্লাহিল গালিব বলেন, “অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে যে স্ট্রোকের পর রোগীর জীবন বাঁচলেই বুঝি সব শেষ। অথচ স্ট্রোকের আসল লড়াই শুরু হয় এর পরে। মস্তিষ্কের যে অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাকে রি-ট্রেনিং বা পুনর্গঠন করতে ফিজিওথেরাপির বিকল্প নেই। আমাদের দেশে রিহ্যাব সেন্টারের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। যদি প্রতিটি অঞ্চলে স্ট্রোক পুনর্বাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকত, তবে লাখ লাখ মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ততার অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারত।”
বাংলাদেশে স্ট্রোক পরবর্তী পুনর্বাসনসেবার প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়টির ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাসেবায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের পুনর্বাসনের সুযোগ রয়েছে। স্ট্রোক পরবর্তী শারীরিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় ফিজিওথেরাপি সেবা এবং এ বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে বিভাগটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, স্ট্রোক পুনর্বাসন বিষয়ে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে যবিপ্রবির ফিজিওথেরাপি বিভাগ। ২০২৩ সালে বিভাগটির উদ্যোগে স্ট্রোক পুনর্বাসনবিষয়ক তিন দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উপলক্ষে স্ট্রোক প্রতিরোধ, ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ট্রোক মোকাবিলায় সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ-তিনটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোক মানেই জীবনের শেষ নয়। সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি ও যথাযথ পুনর্বাসনই হতে পারে নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ। পরিবারের কেউ হঠাৎ স্ট্রোকের লক্ষণগুলোর মুখোমুখি হলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, কারণ প্রতি মিনিটই এক্ষেত্রে মূল্যবান।